Topic: মুয়াম্মার আল-গাদ্দাফির ঐতিহাসিক ভাষণ - ৪

আগের পর্ব-
মুয়াম্মার আল-গাদ্দাফির ঐতিহাসিক ভাষণ - ১
মুয়াম্মার আল-গাদ্দাফির ঐতিহাসিক ভাষণ - ২
মুয়াম্মার আল-গাদ্দাফির ঐতিহাসিক ভাষণ - ৩
--

আফ্রিকার ব্যাপারে বলা যায়, হে ড. তারিকি, চাই তারা জাতিসংঘকে সংস্কার করুক বা না করুক। এমনকী আমার ঐতিহাসিক প্রস্তাপগুলো যা সাধারণ পরিষদে উপস্থাপন করলাম, যার উপর এখন ভোটাভোটি হবে বলে আশা করি; নিরাপত্তা পরিষদে আফ্রিকার একটি স্থায়ী আসন অবশ্যই থাকা উচিত। সকল যোগ্যতায় সমৃদ্ধ একটি আসন। পূর্বেও তাদের এ অধিকার ছিল। জাতিসংঘের সংস্কার এখন হোক আর না হোক। আফ্রিকার একটি আসন অবশ্যই চাই।

আফ্রিকা একটি বিচ্ছিন্ন, নির্যাতিত, কলোনিয়ালাইজড মহাদেশ। তারা আফ্রিকাকে প্রথমে দেখেছে জন্তুতুল্য বস্তু রূপে, এরপর দেখেছে দাস হিসেবে, এরপর উপনিবেশ স্থাপনের স্থল ও রহম-করমের বস্তুরূপে দেখেছে।
এই মহাদেশ। আফ্রিকান ইউনিয়ন, পূর্ব থেকেই একটি স্থায়ী আসনের দাবি রাখে। ঠিক চীনের মতো। এই দাবি ও অধিকারের সাথে জাতিসংঘের সংস্কারের কোনো সম্পর্ক নেই।

এটা প্রায়োরিটির ভিত্তিতে করতে হবে। সাধারণ পরিষদকে এ বিষয়টি এখনোই নিষ্পত্তি করতে হবে। কেউ বলে না যে আফ্রিকা অথবা আফ্রিকান ইউনিয়নের এ দাবি অবান্তর।

যদি কারও কাছে এ ব্যাপারে ভিন্ন কোনো যুক্তি থাকে তবে আমার সামনে হাজির করুক। এ বিষয়ে এ মুহূর্তেই আমার সাথে তর্ক করা যাবে, কোন সমস্যা নেই। যদি কারও কাছে প্রমাণ থাকে বলুক যে আফ্রিকা বা আফ্রিকান ইউনিয়নের স্থায়ী কোনো আসন দরকার নেই। বলুক যে আফ্রিকা মহাদেশের স্থায়ী কোনো আসনের দরকার নেই।

কেউ কোনো যুক্তি দিতে পারবে না।
যেসব দেশে ঔপনিবেশিক দেশগুলো কলোনি স্থাপন করেছিল সেসব দেশকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এ বিষয়ে সাধারণ পরিষদে ভোটাভোটি হতে হবে।
কেন? এই জন্য যে দ্বিতীয়বার আর যেন কেউ এ ধরনের ফিকির করতে না পারে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ও জনমানুষের সম্পদ হরনের ভূমিকায় যেন আর কেউ অবতীর্ণ হতে না পারে।
আফ্রিকানরা ইউরোপে কেন যায়? এশিয়ানরা ইউরোপে কেন যায়, ল্যাটিন আমেরিকা কেন ইউরোপে যায়?!
কেন? কারণ ইউরোপ আফ্রিকা, এশিয়া, ল্যাটিন আমেরিকায় উপনিবেশ স্থাপন করেছিল। তারা স্বর্ণ , রোপা, তামা, লোহা ইউরানিয়ম ও মূল্যবান খনিজপদার্থ, তেল, শাকসবজি , জীবজন্তু এমনকী মানুষ ছিনিয়ে নিয়েছে।
এখন আফ্রিকা, এশিয়া ও ল্যাটিন আমেরিকার নতুন প্রজন্ম এই ছিনিয়ে নেয়া সম্পদের পেছনে দৌড়াচ্ছে। এ ব্যাপারে অবশ্য তাদের অধিকারও রয়েছে। তাদেরকে আমরা ঠেকাতে পারছি না।
আমি যখন লিবিয়ার সীমান্তে ইউরোপগামী হাজার আফ্রিকানকে থামাই, তাদেরকে জিজ্ঞাসা করি, আপনারা  কোথায় যাচ্ছেন। তারা বলে যে আমরা আমাদের  ছিনিয়ে নেয়া সম্পদের কাছে যাচ্ছি। ওটা ফিরিয়ে দিন, তাহলে আমরা যাব না। আমরা থেকে যাব। কে তাদেরকে এ সম্পদ ফিরিয়ে দেবে? আপনারা ফিরিয়ে দিন। আপনারা একটি সিদ্ধান্ত নিন যে এ সম্পদ তাদের কাছে ফিরে আসবে। এরপর মাইগ্রেশনও বন্ধ হয়ে যাবে।
ফিলিপাইন থেকে ল্যাটিন আমেরিকা, মরিসিয়স থেকে ভারত পর্যন্ত আমরা যেসব দেশে রয়েছি তাদের ছিনিয়ে নেয়া সম্পদ ফিরিয়ে দিন।

আফ্রিকা ৭৭৭ ট্রিলিয়ন ক্ষতিপূরণ পাবে। উপনিবেশবাদী দেশগুলোর উচিত এগুলো ফিরিয়ে দেওয়া। আফ্রিকা তাদের এই দাবি কখনো ছাড়বে না।
যদি ৭৭৭ আমাদেরকে ফিরিয়ে না দেয়া হয় তবে আফ্রিকানরাও তাদের সম্পদ যেখানে বিনিয়োগ করা হয়েছে সেখানে যাবে। তাদের এ অধিকার রয়েছে যে তারা তাদের সম্পদের পেছনে যাবে।
তাদের সম্পদ ফিরিয়ে দিন অথবা তাদেরকে ঠেকান।
লিবিয়ানরা ইটালিতে, যা তাদের নিকটতম দেশ, মাইগ্রেশন করে না।
লিবিয়ানরা ইটালিতে কেন মাইগ্রেশন করে না? কারণ ইটালি লিবিয়ার  সন্তানদেরকে ঔপনিবেশিক  সময়ের জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি হয়েছে। ইটালি দুঃখ  প্রকাশ করেছে। ইটালীয় ও  লিবীয় জনতার মাঝে এ বিষয়ে  চুক্তি হয়েছে।
অতীতের অধ্যায় চুকিয়ে  দেয়া হয়েছে। ইটালি স্বীকার করে নিয়েছে যে উপনিবেশবাদ ভুল, এটা একটা ব্যর্থ প্রোগ্রাম যা আর কোনো দিন ফিরে আসবে না।
ইটালি, ইটালির সীমানা থেকে লিবিয়ার উপর কোনো আক্রমণকে মেনে নেবে না। তা স্থল, জল ও আকাশ যে পথেই হোক না কেন?

এ ব্যাপারের একটি অঙ্গীকারপত্রে ইটালীয় পার্লামেন্ট একমত হয়েছে। ইটালি লিবিয়াকে ২০ বছরের ক্ষতিপূরণ দেবে, যে ২০ বছর সে লিবিয়াতে উপনিবেশ স্থাপন করে রেখেছিল। প্রতিবছর ইটালি ২৫ বিলিয়ন করে দেবে। ইটালি লিবিয়ানদের জন্য একটি হাসপাতাল নির্মাণ করবে, যারা হাত পা হারিয়েছে, মাইনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের অঙ্গ পুনরস্থাপনের জন্য।
ইটালি ওজর পেশ করেছে, তাদের উপনিবেশের সময়টার  জন্য আফসোস করেছে। ইটালি বলেছে  এটা অসম্ভব যে একটা দেশ অন্য আরেকটা   দেশের উপর উপনিবেশ স্থাপন করবে, একটা দেশ অন্য আরেকটা দেশের ভূমি দখল করবে এবং সেখানে অবস্থান করবে। এটা ঐতিহাসিক ভুল যা রাজকীয় ও ফ্যাশিস্ট যুগের ইটালি করেছে।
এটা হল বর্তমান ইটালি যা সম্মানজনক অবস্থানে অধিষ্ঠিত হয়েছে। এটা নিশ্চয় একটা ঐতিহাসিক কর্ম। বার্লোস্কোনির শাসনামালে একটি সভ্যোচিত কীর্তি। এ কীর্তি অন্যদের জন্য উদাহরণ। যারা বার্লোস্কোনির পূর্বে ছিল,  তারা এই ফলাফলের পথ নির্মাণ করেছে।

তৃতীয় বিশ্ব ক্ষতিপূরণ দাবি করবে। কেন? কারণ, যাতে উপনিবেশের পুনরাবৃত্তি না ঘটে। কেননা  যাতে তৃতীয় বিশ্বের যে কোনো দেশের জানা থাকে, যদি কোনো দিন শক্তিধর হয়ে  উঠে এবং বড় রাষ্ট্রগুলোর কোন একটি দ্বিতীয় বা তৃতীয় বিশ্বে পরিণত হয়, যাতে তার উপর উপনিবেশ চাপিয়ে দিতে সাহস না পায়। কেননা তাকেও পরবর্তীতে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। তাহলে আপনি বলেবন যে, না আমি উপনিবেশ স্থাপন করতে যাব না।
যাতে উপনিবেশবাদ ফিরে না আসে সে জন্যই ঔপনিবেশিক দেশগুলোর হিসাব নেয়া উচিত। তাদেরকে অপরাধী বলে সাব্যস্ত করা উচিত। যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার ক্ষতিপূরণ নেওয়া উচিত।
তারপর যে বিষয়টি ধৈর্যের সাথে মুকাবিলা করতে চাই , তবে এ আলোচনায় যাওয়ার আগে, যা কিছুটা স্পর্শ কাতর, দুই বন্ধনীর মাঝে একটি কথা বলে নিতে চাই।

“ আমরা যারা সত্যিকার আফ্রিকান, আমরা আসলেই খুশি, এবং গর্বিত যে আফ্রিকার জনৈক সন্তান বর্তমান আমেরিকা শাসন করছে। এটা একটা ঐতিহাসিক ঘটনা।
এমনতো একদিন ছিল যখন কৃষ্ণাঙ্গরা শ্বেতাঙ্গদের চা দোকানেও ঢুকতে পারত না। যে রেস্টুরেন্টে সাদা কোনো লোক রয়েছে সেখানে ঢুকতে পারত না.. যে বাসে শ্বেতাঙ্গ রয়েছে সে বাসে উঠতে পারত না। আর এখন আমেরিকানরা অভূতপূর্ব উৎসাহের সাথে আফ্রিকান  কেনিয়ান কালো এক যুবক ওবামাকে ভোট দিয়েছে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য।
এটা একটা বিশাল ব্যাপার। আমারা এ নিয়ে গর্বিত। আমরা মনে করি যে এটা পরিবর্তনের একটা শুরু যার  স্লোগান সে উঁচু করেছে।

তবে আমার ক্ষেত্রে, আমি মনে করি, ওবামা অন্ধকারে একটি আলোর ছটা যা স্থায়ী থাকবে চার বছর বা আট বছর।  ভয় হচ্ছে যে এরপর সবকিছু আবার প্রাচীন ঘরে ফিরে যাবে।
ওবামার পর আমেরিকার ব্যাপারে কে আমাদেরকে নিশ্চিত করবে, কে? আপনাদের মধ্যে কে নিশ্চিয়তা দেবে? আপনি কি নিশ্চিয়তা দেবেন? হে আলী অথবা কি-মোন! আপনারা কি আমাদেরকে নিশ্চিয়তা দেবেন? !
সম্ভব না, আপনারা কেউ আমাদেরকে নিশ্চিয়তা দিতে পারবেন না।
ওবামা যদি সবসময়ের জন্য আমেরিকার মসনদে থাকে তাহলে আমরা আশ্বস্ত।
আমার পূর্বে আমাদের সন্তান ওবামা যে বক্তৃতা করল, তার সাথে আমরা ঘুণাক্ষরেও ভিন্নমত পোষণ করি না। আমরা আমেরিকার যত প্রেসিডেন্ট পেয়েছি সকলের থেকে তার বক্তৃতা অন্যরকম।
পূর্বের আমেরিকানরা কি বলত? তারা বলত : আমরা তোমাদের উপর গুলি, বোমা বর্ষণ করব।  আমরা তোমাদের প্রতি রোষানলের গুচ্ছ বোমা বর্ষণ করব। আমরা তোমাদের প্রতি ডেজার্ট স্ট্রম পাঠাব। আমরা তোমাদের প্রতি নিরবচ্ছিন্ন বজ্র প্রেরণ করব। আমরা লিবিয়ার বাচ্চাদের জন্য বিষাক্ত গোলাপ পাঠাবো, ৮৬ সালে।
কথাবার্তা এরকমই ছিল। এভাবেই তারা বিশ্ববাসীকে ভয় দেখাত। তারা বলত যে তোমাদের প্রতি অনবরত বজ্র বর্ষণ করব, যেরূপ পাঠিয়েছি ভিয়েতনামের উপর। আমরা তোমাদের উপর ডেজার্ট স্ট্রম পাঠাব যেমন পাঠিয়েছি ইরাকের উপর।
আমরা তোমাদের প্রতি অশ্বারোহী প্রক্রিয়া পাঠাব যেমন পাঠিয়েছি মিসরে ৫৬ সালে। যদিও আমেরিকা সেসময় অশ্বারোহী প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে ছিল। আমরা তোমাদের প্রতি kat noy  পাঠাব,  যা রিগ্যান লিবিয়ান জনতার উপর ৮৬ সালে পাঠিয়েছে।

আপনারা চিন্তা করে দেখুন। একটি বড় দেশের প্রেসিডেন্ট আমরা যার  ব্যাপারে আশ্বস্ত, যার রয়েছে নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী আসন। আমরা মনে করেছিলাম যে সে আমাদের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করবে, তবে সে তা করে নি। সে বরং লিবিয়ার বাচ্চাদের প্রতি বিষাক্ত গোলাপ প্রেরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যে তা  শুঁকবে  মারা যাবে।
বিষাক্ত গোলাপ কি? তা হল লেজার বোমা, যা f.111  ফাইটার বহন করেছে।
এটাই ছিল সে সময়ের ভাষা যখন আমেরিকার কোনো প্রেসিডেন্ট এ মেম্বরে দাঁড়াত। তারা বলত যে আমরা পৃথিবী চালাব, যারা আমাদের বিরুদ্ধে যাবে আমরা তাদেরকে উচিত শিক্ষা দেব।  তোমাদের পছন্দ হোক বা না হোক।
তবে এখন আমাদের ছেলে ওবামা যে কথা বলল তা কত ভিন্ন। সে ঐকান্তিকভাবে পারমাণবিক অস্ত্র থেকে মুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। আমরা নিশ্চয় এ কথা সমর্থন করি।
সে বলেছে যে আমেরিকা একা পৃথিবীর তাবৎ সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। বরং পৃথিবীবাসীকেও নিজেদের সমস্যাগুলো নিজেদেরকেই সমাধানের চেষ্টা করতে হবে।
সে বলেছে,’ আমরা বর্তমানে যে অবস্থায় আছি তা চলতে দেওয়া যায় না। বক্তৃতা দেব আর চলে যাব।‘ ওবামার এ কথার উপরও আমরা একমত।

সে বলেছে,’জাতিসংঘ সবসময় একটা বাক্বিতণ্ডা উপস্থাপনের স্থল ছিল যেখানে আমরা একত্রিত হই একে অন্যকে হামলা করার জন্য।‘ হ্যাঁ। এ অবস্থা থেকে অবশ্যই আমাদের বের হয়ে আসা উচিত। আমরা এমন কিছু আন্তর্জাতিক সংঘটন বানাবো যেখানে সবাই সমান থাকব। যেখানে আমরা প্রশান্তি অনুভব করব।
সে বলেছে,’ বাইরে থেকে কারও উপর গণতন্ত্র চাপিয়ে দেয়া যাবে না।‘
পক্ষান্তরে এইতো সেদিন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট এর মুখে বলতে শুনতাম,’ ইরাকের উপর গণতন্ত্র আরোপ করতে হবে, অমুক অমুকের উপর গণতন্ত্র আরোপ করতে হবে।‘
ওবামা বলেছে,’ এটা একটা অভ্যন্তরীণ ব্যাপার.. কোনো দেশ গণতন্ত্র বাস্তবায়ন করবে বা করবে না.. প্রত্যেকেই যার যার কালচার নিয়ে থাকবে। প্রত্যেকে যার যার ঐতিহ্য নিয়ে থাকবে।
হ্যাঁ, এ কথা পূর্বে অনুপস্থিত ছিল।

(চলবে...) - পরের পর্ব

যে সহশীলতা আর সৌন্দর্যের গুনে ইসলাম পৃথিবী জয় করেছিলো,
সেই সহনশীলতা আর সৌন্দর্য আজকের মুসলমানদের ভেতরে অনুপস্থিত! আফসোস!!

Re: মুয়াম্মার আল-গাদ্দাফির ঐতিহাসিক ভাষণ - ৪

চালিয়ে যান। সবটা পড়ে অনেক কিছু জানাব। ধন্যবাদ।।

যমানার সাথে বদলায় যারা, তারা বড় অসহায়।
তাহারাই মহামানব, যারা যমানারে বদলায়।।