Topic: জিলহজ্জ মাসের প্রথম ১০ দিনের গুরুত্ব ও করণীয়।
জিলহজ্জ মাসের প্রথম ১০ দিনের গুরুত্ব ও করণীয়ঃ
জ়িলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিন আল্লাহর কাছে আর সমস্ত দিনের চেয়ে উত্তম। মহান আল্লাহ অনন্য কুদরতের অধিকারী; জমীন ও আসমানগুলো এবং এর মাঝে যা আছে তার সব কিছুর স্রষ্টা তিনি। তিনি সৃষ্টি করেন আর এ সৃষ্টির মাঝ থেকে বাছাই করে কিছু কিছু সৃষ্টিকে অন্য সৃষ্টির উপর মর্যাদা দান করেন। তিনি তাঁর সমস্ত সৃষ্টির উপর মানুষকে বাছাই করেছেন; আবার মানুষের মধ্য থেকে নবীদেরকে বাছাই করেছেন; আবার এই নবীদের মধ্য থেকে মুহাম্মদকে [সল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম] বাছাই করেছেন; তিনি দিন সৃষ্টি করেছেন আর এর মধ্য থেকে জুমু’আর দিনকে সবচেয়ে মর্যাদাশালী করেছেন; তিনি রাত সৃষ্টি করেছেন আর এর মধ্য থেকে রমজানের শেষ ১০ রাতকে বাছাই করেছেন এবং এর মধ্য থেকে আবার ক্বদর রাতকে বাছাই করেছেন। তিনি তাঁর সুমহান কিতাবে সত্যিই বলেছেনঃ
وَرَبُّكَ يَخْلُقُ مَا يَشَاء وَيَخْتَارُ
“আর তোমার রব্ব যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন এবং বাছাই করেন।” [আল-কুরআন, ২৮/৬৮]
জ়িলহজ্জের প্রথম ১০ দিনের গুরুত্ব
আল্লাহ তা'আলা দিনগুলোর মধ্য থেকে জ়িলহজ্জ মাসের ১০ দশ দিনকে বাছাই করেছেন এবং এগুলোকে মর্যাদাশীল করেছেন। এ সম্পর্কে কুর’আনে হাদীসে এবং সাহাবী ও তাবেয়ীদের থেকে আলোচনা এসেছে।
১। কুর’আনে সূরা ফজরে আল্লাহ বলেছেন وَلَيَالٍ عَشْر। অধিকাংশ মুফাসসিরীনদের মতে এগুলো জ়িলহজ্জ মাসের প্রথম দশদিন প্রসঙ্গে।
২। বুখারীতে আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস বর্ণনা করেছেনঃ রসূলুল্লাহ [সঃ] বলেছেন, “এই দশ দিনের মধ্যে কৃত ভাল কাজ [আমল সালিহ] এর সমান আর কিছু নেই।” [লোকেরা] বলল, “এমনকি আল্লাহর পথে জিহাদও কি নয়?” তিনি [সঃ] বললেন, “এমনকি আল্লাহর পথে জিহাদও নয়, তবে যদি কোন মুজাহিদ নিজের জান এবং মাল নিয়ে বেরিয়ে গিয়ে আর ফিরে না আসে তাহলে ভিন্ন কথা।”
عنْ سَعِيدِ بْنِ جُبَيْرٍ عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا مِنْ أَيَّامٍ الْعَمَلُ الصَّالِحُ فِيهِنَّ أَحَبُّ إِلَى اللَّهِ مِنْ هَذِهِ الْأَيَّامِ الْعَشْرِ فَقَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ وَلَا الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَلَا الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ إِلَّا رَجُلٌ خَرَجَ بِنَفْسِهِ وَمَالِهِ فَلَمْ يَرْجِعْ مِنْ ذَلِكَ بِشَيْءٍ
৩। আল্লাহ তা’আলা আরো বলেছেনঃ وَيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ فِي أَيَّامٍ مَّعْلُومَاتٍ “আর তারা নির্দিষ্ট কিছু দিনে আল্লাহর নাম বেশী বেশী স্মরণ করবে।” [আল-কুরআন, ২২/২৮]। এ আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে ইবন আব্বাস [রাঃ] বলেছেন যে এ দিনগুলো হচ্ছে জ়িলহজ্জের প্রথম ১০ দিন। [ইবন কাসীর]
৪। ইবন আব্বাসের [রাঃ] এ ব্যাখ্যার সমর্থনে মুসনাদে আহমদে ইবন উমর [রাঃ] বর্ণিত একটা হাদীসের ভাষা নিম্নরূপঃ
عَنْ ابْنِ عُمَرَ: عَنْ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ مَا مِنْ أَيَّامٍ أَعْظَمُ عِنْدَ اللَّهِ وَلَا أَحَبُّ إِلَيْهِ الْعَمَلُ فِيهِنَّ مِنْ هَذِهِ الْأَيَّامِ الْعَشْرِ فَأَكْثِرُوا فِيهِنَّ مِنْ التَّهْلِيلِ وَالتَّكْبِيرِ وَالتَّحْمِيدِ
রসূলুল্লাহ [সঃ] বলেছেন, “আল্লাহর কাছে [জ়িলহজ্জ মাসের] এই দশ দিনের চেয়ে মর্যাদাশীল কোন দিন নেই এবং এ দিনগুলোতে করা আমলের চেয়ে প্রিয় কোন আমল নেই। সুতরাং তোমরা এ দিনগুলোতে বেশী বেশী করে তাহলীল [লা ইলাহা ইল্লা আল্লাহ], তাকবীর [আল্লাহু আকবার] ও তাহমীদ [আল-হামদুলিল্লাহ] করো।
৫। উপরে ইবন আব্বাসের [রাঃ] বর্ণনা করা হাদীসের রাবীদের একজন হচ্ছেন প্রখ্যাত তাবি‘ঈ সাঈদ ইবন জুবায়র [রঃ]। এ দশ দিন শুরু হলে তিনি এত বেশি পরিশ্রম করতেন যে তা তকে কাহিল করে ফেলত। [সুনান আদ-দারিমী]
৬। ইবন হাজার আল-আসক্বালানী [রঃ] তাঁর ফতহুল বারীতে উল্লেখ করেছেন যে এ দিনগুলোর এত বেশী মর্যাদা হবার কারণ হল যে এ দশদিনে অত্যন্ত মর্যাদাশীল সব ইবাদতগুলোর সমাবেশ হয়। আর এগুলো হচ্ছে নামাজ, রোজা, সদাকাহ, এবং হজ্জ। এটা আর কখনো হয় না।
এ দিনগুলোতে কী কী আমল করা দরকার?
১। সালাত
আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য করা আমলগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম হচ্ছে নামাজ। ফরজ় নামাজগুলো প্রথম ওয়াক্তে আদায় করা এবং ফরজ় নামাজের অতিরিক্ত নফল আমাদের এ সময়ে বেশী বেশী করা উচিৎ। ইমাম মুসলিম [সঃ] তাঁর সহীহতে নিম্নোক্ত হাদীসটি সংকলন করেছেনঃ
مَعْدَانُ بْنُ أَبِي طَلْحَةَ الْيَعْمَرِيُّ قَالَ لَقِيتُ ثَوْبَانَ مَوْلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقُلْتُ: أَخْبِرْنِي بِعَمَلٍ أَعْمَلُهُ يُدْخِلُنِي اللَّهُ بِهِ الْجَنَّةَ أَوْ قَالَ قُلْتُ بِأَحَبِّ الْأَعْمَالِ إِلَى اللَّهِ فَسَكَتَ ثُمَّ سَأَلْتُهُ فَسَكَتَ ثُمَّ سَأَلْتُهُ الثَّالِثَةَ فَقَالَ سَأَلْتُ عَنْ ذَلِكَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ عَلَيْكَ بِكَثْرَةِ السُّجُودِ لِلَّهِ فَإِنَّكَ لَا تَسْجُدُ لِلَّهِ سَجْدَةً إِلَّا رَفَعَكَ اللَّهُ بِهَا دَرَجَةً وَحَطَّ عَنْكَ بِهَا خَطِيئَةً
মু’আজ় ইবন আবী তলহা আল-ইয়ামারী বলেনঃ আমি রসূলুল্লাহর [সঃ] আযাদ করা গোলাম সাওবান [রাঃ] এর সাথে সাক্ষাৎ করলাম এবং তাঁকে বললাম, “আপনি আমাকে এমন একটা আমলের কথা বলে দিন যে আমল করলে আল্লাহ আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন অথবা আল্লাহর কাছে প্রিয় আমলটির কথা জিজ্ঞেস করলাম।” কিন্তু তিনি চুপ থাকলেন। আমি আবারও তা জিজ্ঞেস করলাম, কিন্তু তিনি চুপ থাকলেন। আমি তাঁকে তৃতীয়বার জিজ্ঞেস করলাম। তিনি তখন বললেন, “আমি এ বিষয়ে রসূলুল্লাহকে [সঃ] জিজ্ঞেস করেছি।” তিনি [সঃ] বলেছেন, “তুমি আল্লাহর জন্য বেশী বেশী সিজদা আদায় করবে। কারণ তুমি যতগুলো সিজদা আদায় করবে তার প্রত্যেকটার বদলে তোমার মর্যাদা বাড়ানো হবে এবং তোমার গোনাহগুলো মুছে দেয়া হবে।”
২। সাওম [রোজ়া]
এ দিনগুলোতে [ঈদের দিন ছাড়া] রোজা রাখা দরকার আমাদের। রসূলুল্লাহ [সঃ] এ দিনগুলোতে রোজা রেখেছেন।হুনায়দা ইবন খালিদ তাঁর স্ত্রী থেকে যিনি রসূলুল্লাহর কয়েকজন স্ত্রীর কাছ থেকে বর্ণনা করেছেনঃ
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَصُومُ تِسْعَ ذِي الْحِجَّةِ وَيَوْمَ عَاشُورَاءَ وَثَلَاثَةَ أَيَّامٍ مِنْ كُلِّ شَهْرٍ
রসূলুল্লাহ [সঃ] জ়িলহজ্জের ৯ দিন, আশুরার দিন, এবং প্রত্যেক মাসে তিন দিন রোজা রাখতেন। [আহমদ, নাসায়ী ও অন্যান্যরা]
আরাফাতের দিনের রোজাঃ জ়িলহজ্জের এই দশদিনের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আরাফাতের দিন রোজা রাখা।
صِيَامُ يَوْمِ عَرَفَةَ أَحْتَسِبُ عَلَى اللَّهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِي قَبْلَهُ وَالسَّنَةَ الَّتِي بَعْدَهُ
এদিনের রোজা আগের একবছর এবং পরের এক বছরের গোনাহ মিটিয়ে দেয় বলে জানিয়েছেন রসূলুল্লাহ [সঃ]। ইমাম মুসলিম আবূ ক্বাতাদাহ [রাঃ] থেকে হাদীসটি সংকলন করেছেন।
৩। তাহলীল তাকবীর ও তাহমীদ পড়া
আগেই একটা হাদীসে আমরা দেখেছি যে রসূলুল্লাহ [সঃ] এ দিনগুলোতে বেশী বেশী তাহলীল, তাকবীর ও তাহমীদ করতে বলেছেন। ইমাম বুখারী বর্ণনা করেছেন যে ইবন উমর [রাঃ] এবং আবূ হুরায়রা [রাঃ] এ দশদিনে বাজারে যেতেন ও তাকবীর পড়তেন এবং তাঁদের সাথে মানুষেরাও তাকবীর পড়ত। ইমাম বুখারী আরো বলেছেন যে উমর [রাঃ] মিনায় তাঁর অবস্থান স্থলে তাকবীর পড়তেন আর মসজিদে অবস্থানকারীরা তাঁর তাকবীর শুনে তাঁরাও তাকবীর পড়তেন। রাস্তায় এবং বাজারে যারা থাকতেন তারাও তাকবীর পড়তেন এমনকি গোটা মিনা তাকবীরে মুখরিত হয়ে উঠত। ইবন উমর [রাঃ] এ দশদিনেই তাকবীর পড়তেন; তিনি তাঁর নামাজের পরে এবং বিছানায়ও পড়তেন; তাঁর তাঁবুতে পড়তেন আবার মজলিসেও পড়তেন।” তাকবীরের ভাষা হচ্ছে “আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবা্র, লা ইলাহা ইল্লা আল্লাহু ওয়া আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহি আল-হামদ।”
৪। কুরবানী করা
এ দশদিনের অন্যতম হচ্ছে ইয়াওমুন নাহর বা কুরবানীর দিন। আল্লাহর ওয়াস্তে তাঁর ভালবাসায় উদবুদ্ধ হয়ে গৃহপালিত পশুগুলোর একটা এদিন কুরবানী করেন সক্ষম মুসলিম। যাঁরা কুরবানী দিবেন তাঁদের উচিৎ হচ্ছে জ়িলহজ্জের শুরূ থেকে কুরবানী করা পর্যন্ত শরীরের কোন ধরণের লোম [চুল, গোঁফ, দাড়ি, ইত্যাদি] না ছাটা বা না কামানো, নখ না কাটা ও শরীর থেকে কোন জিনিষ না সরানো।
প্রিয় ভাই ও বোনেরা, আসুন আমরা এ দিনগুলোর গুরুত্ব অনুধাবনের চেষ্টা করি এবং এ দিনগুলোতে আল্লাহর পসন্দনীয় আমলগুলো করে তাঁর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করি।
নোটঃ পোস্ট হেডিং এডিট করে দিলাম [নভেম্বর ১৯, ২০০৯]
Last edited by আবূসামীহা (2009-11-20 01:17:42)
সেরিঙ্গাপট্টম বালাকোট ঋনী হল আমাদের তেগ সঙ্গীতে
ধমনীতে লয়ে সেই শাহাদাত সঙ্গীত মদীনার নব ভিত গড়েছি
সত্যের সংগ্রাম করেছি।

