Topic: সম্পত্তিতে নারীর অধিকার : শেখ হাসিনার ভাবনা এবং কিছু প্রস্তাব
সুলেখক জনাব সোহেল মাহমুদ দৈনিক নয়া দিগন্তে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধটি লিখেছেন।
লিংক: http://www.dailynayadiganta.com/fullnew
&sec=6
সম্পত্তিতে নারীর অধিকার : শেখ হাসিনার ভাবনা এবং কিছু প্রস্তাব
সোহেল মাহমুদ
কয়েক বছর আগে আমেরিকা সফরের সময় টালসা নগরীতে সাক্ষাত হয়েছিল এক মার্কিন নারীনেত্রীর সাথে। তিনি কয়েক বছর আগে খ্রিষ্টধর্ম ছেড়ে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। এখনো তিনি আগের মতোই কমিউনিটির একজন নেত্রী। বর্তমান নাম শেরিল সিদ্দিকী। বিয়ে করেছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত হায়দ্রাবাদের একজন মুসলমানকে। আলাপে জানালেন, তিনি প্রায়ই আমেরিকান মহিলাদের কাছে ইসলাম প্রচারের জন্য যান। ইসলামের বিভিন্ন দিক তাদের সামনে তুলে ধরেন। তিনি নারীর মর্যাদা ও অধিকার প্রশ্নে ইসলামের নীতি সম্পর্কে যখন বলেন, ইসলামে স্ত্রী ও সন্তানদের ভরণপোষণের দায়িত্ব স্বামীর ওপর বর্তায়; এ ব্যাপারে স্ত্রীর কোনো দায়িত্ব নেই এবং স্ত্রী চাকরি বা ব্যবসায় করলে তার আয় অন্য কাউকে দিতে বাধ্য নন। এ কথা জানার পর মার্কিন তরুণীরা মুসলমান স্বামী গ্রহণে আগ্রহ প্রকাশ করেন। অনেক মার্কিন মহিলা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন তাদেরকে স্বামীর সাথে বাজার খরচ, বাড়ি ভাড়া, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও টেলিফোন বিল থেকে শুরু করে সব কিছুতে শেয়ার করতে হয়। অনেক আমেরিকান মেয়ে এখন বিয়ে করতে চান না। তারা বিস্মিত হন, মুসলিম নারীদের এ বিষয়ে কোনো ভাবনা নেই; বরং তারা চাকরি বা ব্যবসায় করে স্বাচ্ছন্দ্যে আয় করতে পারেন।
নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্খার উদ্যোগে নানা ধরনের অনুষ্ঠান হয়ে গেল। প্রতি বছরই এরূপ অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। পুরো অনুষ্ঠান জুড়ে একটিই কথা ‘নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’ নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে কী কী প্রতিবন্ধকতা আছে তা-ও আলোচনা হয় এবং নানাজন নানা পরামর্শ দিয়ে থাকেন সমস্যা উত্তরণে। বাংলাদেশের নারীদের প্রতি বিভিন্ন বৈষম্য ও নির্যাতনের অবসান হওয়া দরকার এবং নারীদের মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে এই মৌলিক বিষয়ে বিশেষ কোনো বিতর্ক নেই। কিন্তু কোন উপায়ে তা প্রতিষ্ঠা করতে হবে সেটি নিয়ে বেশ মতপার্থক্য রয়েছে।
বাংলাদেশের নারীদের প্রতি বৈষম্য ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে যেসব নারী সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে সোচ্চার তাদের মতাদর্শ প্রধানত বাম ধারার। বাম প্রভাববলয়ের বাইরে যারা আছেন, তারাও নিজেদের অজান্তে নারীদের সমস্যার সমাধান খোঁজেন বাম চিন্তাধারার আলোকে। বলাই বাহুল্য, বাম চিন্তাধারায় ধর্মের বিশেষত ইসলামের বিরুদ্ধে জেনে না জেনে অবস্খান নেয়ার একটা প্রবণতা আছে। ফলে বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের নেত্রীরা অìধকারে কোপ দেয়ার মতো নারীর অনগ্রসরতার জন্য ধর্মকে অভিযুক্ত করতে কৃপণতা করেন না। অবশ্য এটাও সত্য, এ দেশের আলেম সমাজ ও ইসলামী পণ্ডিতরা তাদের বক্তব্য-বিবৃতি ও ভাষণে নারীর অধিকারের বিষয়টি তেমন গুরুত্বের সাথে তুলে ধরতে পারেননি। ইসলামি নারী সংগঠনগুলোর কোনো ভূমিকাও জোরালো নয়।
ইতিহাস নির্দ্বিধায় বলছে, ইসলামই পৃথিবীতে প্রথম নারীর মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে দৃঢ় ও স্পষ্ট ভূমিকা নিয়েছে। আমাদের নবী মুহাম্মদ সা: কন্যা-জায়া-জননী তথা নারী জাতিকে যে মর্যাদার আসনে বসিয়েছিলেন তা তো অস্বীকার করার উপায় নেই। এটা জানা সত্ত্বেও বাম ও তথাকথিত প্রগতিবাদীরা নারীর মর্যাদা ও অধিকার প্রশ্নে ইসলামের দিকে না তাকিয়ে বাঁকা পথে নানা দিকে সমাধান খুঁজে বেড়াচ্ছেন। নারী অধিকারের প্রশ্ন উঠলেই কমবেশি সবাই বেগম রোকেয়ার কথা বলেন। বাম ধারার সিভিল সোসাইটি বেগম রোকেয়াকে তাদের মতোই তথাকথিত ‘প্রগতিশীল’ হিসেবে উপস্খাপনের চেষ্টা করে। প্রকৃতপক্ষে বেগম রোকেয়া কখনোই তাদের মতো ধর্মবিরোধী বা ইসলামবিরোধী ছিলেন না। তিনি একজন ধর্মপ্রাণ আদর্শ মুসলিম নারী ছিলেন। তিনি ইসলামি মূল্যবোধ লালন করতেন এবং অত্যন্ত শালীন পোশাক পরতেন। তিনি মুসলিম নারীদের প্রকৃত শিক্ষার আলোকে উদ্ভাসিত করতে চেয়েছিলেন। তিনি নারী স্বাধীনতার নামে নারীদের অশালীন ও বেপরোয়া হতে শিক্ষা দেননি।
সে দিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার সরকারের আমলে নারীদের মর্যাদা বাড়ানোর বিভিন্ন উদাহরণ দিয়েছেন এবং মন্ত্রিসভা ও সংসদে নারীদের প্রাধান্যের কথা উল্লেখ করেছেন। বলা বাহুল্য, মন্ত্রিসভা ও সংসদে নারীদের সংখ্যা বাড়ালেই যে নারী অধিকার নিশ্চিত হয় না, তা আমাদের সমাজের দিকে তাকালেই সহজে বোঝা যায়। নারীর সম-অধিকারের কথা আলোচনা করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘সম্পত্তিতে নারীর সম-অধিকার প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে।’ তিনি মিসকি হাসি দিয়ে বলেন, ‘এ বিষয়টি বাস্তবায়নের চিন্তা আমার রয়েছে। যথাসময়ে এটি প্রকাশ করা হবে। না হলে অনেক মহল শরিয়তের দোহাই দিয়ে নানা কিছু বলতে শুরু করবে।’ বুঝতে কারো অসুবিধা নেই যে সম্পত্তিতে নারীর সমান অংশ পাওয়ার ব্যাপারে তিনি একটা উপায়ের কথা ভাবছেন, যা সময় মতো বলবেন।
নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বিভিন্ন দিক রয়েছে এবং এর মধ্যে সম্পত্তির বিষয়টি অন্যতম। সম্পত্তিতে নারীর উত্তরাধিকার কতটুকু সে সম্পর্কে মহান আল্লাহ পবিত্র গ্রন্থ আল কুরআনে সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এতে মৃত ব্যক্তির সম্পত্তিতে তার পুত্র যা পাবে কন্যা পাবে তার অর্ধেক। এ বিষয়টি নিয়ে যুগে যুগে কিছু বিভ্রান্ত লোক অযৌক্তিক প্রশ্ন উথাপন করে চলেছে। আমাদের সমাজেরও বেশ কিছু তথাকথিত প্রগতিবাদী না জেনেশুনে বা বিষয়টির গভীরে না গিয়ে মৃত ব্যক্তির সম্পত্তিতে তার পুত্র-কন্যার সমান অংশের কথা বলে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি তুলছেন। তাদের ভাবখানা এই, মৃত ব্যক্তির সম্পত্তিতে তার পুত্র-কন্যার সমান অংশ নিশ্চিত হলেই দেশে নারীর ক্ষমতায়ন হয়ে যাবে। তারা এ জন্য ইসলামি শরিয়াহ আইন পরিবর্তনের কথা বলেন এবং যারা শরিয়াহ আইনবিরোধী কোনো উদ্যোগের বিরোধিতা করেন তাদেরকে নারী অধিকার বিরোধী, ধর্মাìধ, মৌলবাদী, ফতোয়াবাজ ইত্যাদি অভিধায় কটাক্ষ করা হয়। যারা ইসলামি শরিয়াহ আইন চান তারা কি আসলে নারীর অধিকার চান না? বিষয়টি এভাবে দেখলে ভুল করা হবে। বিষয়টি নিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করতে হবে। পারিবারিক আইনের ক্ষেত্রে সব দেশেই কমবেশি ধর্মীয় আইনকে প্রাধান্য দেয়া হয়। আমাদের দেশে ব্রিটিশ আমলে বহু আইনের পরিবর্তন আনা হলেও মুসলিম পারিবারিক আইন অক্ষুণí রাখা হয়। ইসলামের পারিবারিক আইনের বিষয়টি সার্বিক অর্থে দেখতে হবে। ইসলাম একজন মুসলমান নারীর অধিকার সংরক্ষণে যেসব ব্যবস্খা রেখেছে তা হলো এক. বিয়ের সময় ন্যায়সঙ্গত মোহরানা ধার্য ও তা পরিশোধ বাধ্যতামূলক; দুই. পরিবারের সদস্যদের তথা স্ত্রী ও সন্তানদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব স্বামীর ওপর বর্তায়; এ ব্যাপারে স্ত্রীর কোনো দায়িত্ব নেই; তিন. স্ত্রী চাকরি বা ব্যবসা করলে তিনি তার আয় অন্য কাউকে দিতে বাধ্য নন; চার. পিতার সম্পত্তিতে কন্যাপুত্রের অর্ধেক পাবে; পাঁচ. পিতা জীবিত অবস্খায় কন্যাকে যা খুশি ‘হেবা’ (গিফট) করে দিতে পারেন।
ইসলাম ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে সম্পত্তিতে নারীর অধিকার নির্ধারণ করেছে। জাস্টিস বা ন্যায়বিচারের সংজ্ঞা সম্পর্কে দার্শনিক প্লোটো বলেছেন, ‘যার যা পাওয়ার যোগ্যতা আছে তাকে সেটি দেয়াই হচ্ছে ন্যায়বিচার।’ মহান আল্লাহ সম্পত্তিতে নারীর যে উত্তরাধিকার বা মিরাস নির্ধারণ করে দিয়েছেন, তা যে সম্পূর্ণ ন্যায়বিচারভিত্তিক সেটি আমরা একটু বিবেচনা করে দেখি।
ধরা যাক, এক ব্যক্তি এক পুত্র ও এক কন্যা রেখে মারা গেলেন। তার সম্পত্তি আল্লাহর আইন মোতাবেক বন্টন করা হলো। মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে পুত্র পেল দুই লাখ টাকা এবং কন্যা পেল এক লাখ টাকা। পুত্র বিয়ে করতে গিয়ে তার স্ত্রীকে মোহরানা দেয়া ও অন্যান্য খাতে ব্যয় করল এক লাখ টাকা। এতে তার হাতে রইল এক লাখ টাকা। এ দিয়ে তার ও তার স্ত্রীর ভরণপোষণ করতে হবে। সন্তান হলে তাদের খরচও বহন করতে হবে পুত্রকে। নতুন কোনো আয় না করে শুধু পিতার সম্পত্তি দিয়ে তার মোটেই চলবে না। অপর দিকে কন্যা পিতার সম্পত্তি থেকে এক লাখ টাকা পেল এবং তার বিয়ে হলে স্বামীর কাছ থেকে মোহরানা হিসেবে এক লাখ টাকা পেল; এতে তার সম্পদের পরিমাণ দাঁড়াল দুই লাখ টাকা। তার নিজের কোনো খরচ নেই, এমনকি সন্তান হলেও তার খরচ করতে হবে না। কারণ ইসলাম স্বামীকে তার স্ত্রী ও সন্তানের ভরণপোষণের দায়িত্ব দিয়েছে। স্ত্রীর সম্পদের ওপর স্বামীর বা অন্য কারো কোনো অধিকার নেই। এমনকি স্ত্রী চাকরি করলে বা ব্যবসায় করলে তা থেকে যে মুনাফা হবে তাতেও কারো কোনো হক নেই। স্ত্রী তার চাকরির বা ব্যবসার আয় স্বামীর সংসারে ব্যয় করতে বাধ্য নয়। তার মানে দাঁড়াচ্ছে স্ত্রীর সম্পদের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বাড়তেই থাকবে। অপর দিকে সংসারের সব খরচ বহনে বাধ্য স্বামীর সম্পদ বাড়ানোর সুযোগ কমে যাবে এবং নানা কারণে তার খরচের পরিমাণ বাড়তে থাকবে। যেমন মুসলমানদের সমাজ-সংস্কৃতিতে পিতার অবর্তমানে পুত্রই বংশের নেতৃত্ব দিয়ে থাকে; যেখানে তার মা, বোন ও আত্মীয়স্বজনের মেহমানদারি এবং বিভিন্ন সামাজিক দায়িত্ব পালনে পুত্রের ওপর ব্যয়ের একটা দায়-দায়িত্ব থাকে।
বিষয়টি সম্পর্কে সম্প্রতি ইন্টারনেটে দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক কানিজ ফাতেমার একটি নিবìধ দেখলাম, যাতে তিনি অত্যন্ত সুন্দরভাবে সম্পত্তিতে নারীর অধিকার সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। আগ্রহী পাঠকরা এটি পড়ে দেখতে পারেন। কানিজ ফাতেমা পুত্র ও কন্যার বাস্তব প্রাপ্তির একটি তুলনামূলক চিত্র তার নিবìেধ দিয়েছেন, যা থেকে দেখা যায় যে ইসলামের বন্টননীতি অনুসৃত হলে নারীরা লাভবান হন; ঠকেন না। তিনি আরো বলেছেন, কোনো পিতা চাইলে তার কন্যা/কন্যাদের হেবা বা দান হিসেবে যেকোনো পরিমাণ সম্পত্তি দিতে পারেন। সুতরাং কন্যাদের বঞ্চিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।
এমতাবস্খায় দেখা যাচ্ছে, মহান আল্লাহ ন্যায়বিচার তো বটেই; নারীদের জন্য অধিকতর স্বস্তি ও কল্যাণের ব্যবস্খা করে দিয়েছেন। বিপরীতভাবে প্রগতিবাদীদের দাবি অনুযায়ী যদি পুত্র-কন্যাকে সম্পত্তির সমান অংশ দেয়া হয় তাহলে পুত্রের আর্থিক সামর্থ্যরে বেশ অবনতি ঘটবে এবং কন্যার অবস্খার দ্রুত উন্নতি ঘটবে। এটা তো ন্যায়বিচার হলো না। সে ক্ষেত্রে ইসলামি নীতির পরিবর্তে পাশ্চাত্যের মতো স্ত্রীকেও সংসারের সব খরচের অর্ধেক বহন করার বিধান করতে হবে। সেটি কি স্ত্রী তথা নারীর প্রতি অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে দেয়া হবে না? আমাদের মা-বোন-জায়ারা কি এতে খুশি হবেন?
তথাকথিত প্রগতিবাদীরা প্রশ্ন করতে পারেন, বুঝলাম ইসলাম মুসলিম নারীকে নানাবিধ সুবিধা দিয়েছে; কিন্তু সেগুলো প্রতিপালিত হচ্ছে কোথায়? এরূপ প্রশ্ন অবশ্যই প্রসঙ্গিক। এ ক্ষেত্রে আমাদের সমাজের বাস্তব চিত্র অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক। আমরা দেখতে পাচ্ছি, সমাজে বিয়ের সময় ন্যায়সঙ্গত মোহরানা ধার্য হচ্ছে না এবং তা বাধ্যতামূলকভাবে পরিশোধ করা হচ্ছে না। এমনকি মোহরানার বিষয়ে বিবাহিত নারীর কোনো ভূমিকাই থাকে না। নারী বা পুরুষ অনেকে ভালোমতো জানেনও না যে স্ত্রীকে মোহরানা দেয়া ফরজ বা অবশ্য কর্তব্য এবং এটি না দিলে আখিরাতে জবাবদিহি করতে হবে। স্ত্রী ও সন্তানদের ভরণপোষণের দায়িত্ব স্বামীর ওপর বর্তালেও ইদানীং চাকরিজীবী স্ত্রীকে সংসারের খরচ দিতে বাধ্য করা হয়। অনেক যুবক চালাকির সাথে চাকরিজীবী স্ত্রী পছন্দ করেন। পিতার সম্পত্তিতে কন্যা পুত্রের অর্ধেক পাওয়ার কথা থাকলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বোনেরা ভাইদের কাছ থেকে পিতার সম্পত্তির অংশ আদায় বা ভোগ করতে পারেন না। পিতা জীবিত অবস্খায় কন্যাকে বিয়ে দেয়ার সময় যা খুশি উপঢৌকন দিতে পারলেও বাস্তবতা হচ্ছে কন্যার পরিবর্তে দিতে হয় জামাইকে খুশি করার জন্য বিরাট আকারের যৌতুক। পিতা বা কন্যা তা দিতে ব্যর্থ হলে কন্যাকে সইতে হয় নির্যাতন, এমনকি জীবনও দিতে হয়। সুতরাং সঙ্গতভাবেই প্রশ্ন তোলা যায়, আমাদের সমাজের এই অজ্ঞতা ও দায়িত্বহীনতার মধ্যে কিভাবে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে? কিন্তু লক্ষ করুন, নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় ইসলামের নীতিমালা অত্যন্ত সুস্পষ্ট। কিন্তু সমাজে যদি তা অনুশীলন করা না হয় সে জন্য তো ইসলামের নীতি দায়ী হতে পারে না, বরং আমরাই অভিযুক্ত। এ ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা এসে যায়। সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের ধর্ম ইসলাম এবং রাষ্ট্রীয় যেসব আইন রয়েছে তা বাস্তবায়নে কঠোর হওয়া। এসব বিধিবিধান কার্যকর না করে নতুন নতুন আইন বা নীতি তৈরির কসরত করে বিশেষ লাভ হবে না। এ প্রসঙ্গে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব বিবেচনা করা যেতে পারে
ক. ইসলামি শরিয়ার আলোকে ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে সম্পত্তিতে নারীর অধিকার নির্ধারণ করার জন্য সরকার বিশিষ্ট আলেম, ইসলামি পণ্ডিত ও আইনজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করতে পারেন। এ কমিটি ইসলামের বিভিন্ন ফিকাহর বিভিন্ন সিদ্ধান্ত (ফতোয়া) পর্যালোচনা করে সরকারকে উত্তম পরামর্শ দিতে পারে।
খ. নারী তার পিতার সম্পত্তি থেকে যা পাবে তা আদায়ে বিশেষ আইন করা যেতে পারে। বিশেষ করে নারী যাতে পিতার সম্পত্তির অংশ হিসেবে তার বাড়িতে ন্যায্য অংশ পায় তা নিশ্চিত করার জন্য দেশের বিদ্যমান কোনো আইনে জরুরিভিত্তিতে তা অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। এর ফলে একজন নারী যদি তালাকপ্রাপ্ত হয় সে ক্ষেত্রে তার বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেয়ার ব্যাপারে শক্ত অধিকার সৃষ্টি হবে। এর ফলে ভাইদের পক্ষ থেকে বোনদের ঠকানোর বা বঞ্চিত করার অন্তত একটা সুযোগ কমে যাবে।
গ. পিতা যদি ইচ্ছে করেন তিনি তার কন্যাকে জীবিত থাকাকালে কিছু হেবা (গিফট) করবেন, সে ক্ষেত্রে বর্তমানে সরকারি রেজিস্ট্রেশন ফি অনেক। এ সমস্যা দূর করার জন্য রেজিস্ট্রেশন ফি হন্সাসকৃত হারে নির্ধারণের জন্য সরকার আইনগত ব্যবস্খা নিতে পারে। এ বিষয়ে আলেম সমাজ বা ইমামরা জনসাধারণকে গুরুত্ব সহকারে নসিহত করতে পারেন।
স্ত্রীর মোহরানা নির্ধারণে সরকার একটি নীতিমালা করে দিতে পারে। এ জন্য বিশিষ্ট আলেম ও আইনজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি কমিটি করে দেয়া যেতে পারে। মোহরানা পরিশোধ নিশ্চিত করার জন্য কঠোর আইন করা হোক। একজন নারী যদি বিয়ের সময় শুধু ন্যায্য মোহরানার অর্থ হাতে পায় এবং তা সংরক্ষণ করতে পারে তাহলে দেশে নারীর ক্ষমতায়ন অনেক দূর এগিয়ে যাবে। নারী সংগঠনগুলো এ ব্যাপারে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে। তারা নারীর অর্থনৈতিক নিরাপত্তার উৎস হিসেবে মোহরানা আদায়ের বিষয়টিকে অন্যতম অ্যাজেন্ডা হিসেবে নিতে পারে।
নারী উন্নয়ন নীতিমালায় এটা যোগ করা যেতে পারে যে, পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে স্বামীর অনুমতি নিয়ে স্ত্রী চাকরি বা ব্যবসায় করতে পারবেন, তবে স্ত্রী তার আয় স্বামীর সংসারে দিতে বাধ্য থাকবেন না। স্ত্রী স্বেচ্ছায় যাকে খুশি দিতে পারবেন।
আমার দৃঢ়বিশ্বাস, ইসলামের নীতিমালাগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হলে সমাজে নারীর সুষম অধিকার সুনিশ্চিত হবে। মনে রাখতে হবে, মাথাব্যথা হলে মাথা না কেটে যেমন চিকিৎসা করাই যুক্তিসঙ্গত, তেমনি ইসলামি আইন বাস্তবায়ন না হওয়ার ফলে নারী বঞ্চিত হলে সে জন্য ইসলামি আইনকে দোষী না করে সেটির যথাযথ বাস্তবায়ন করাই তো বুদ্ধিমানের কাজ। অপর দিকে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের নিজ নিজ ধর্মবেত্তা ও আইনজীবীদের পরামর্শের আলোকে তাদের সম্প্রদায়ের নারীদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার প্রতিষ্ঠার ব্যবস্খা করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একজন মুসলিম নারী এবং তিনি সে দিনের বক্তৃতায় উল্লেখ করেছেন, মহানবীর আহ্বানে সর্বপ্রথম সাড়া দিয়েছিলেন একজন নারী এবং ইসলামের প্রথম শহীদও একজন নারী। আমরা মনে করছি, প্রধানমন্ত্রী ইসলামের সৌন্দর্য ও শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে কমবেশি ধারণা রাখেন। তা সত্ত্বেও তিনি শরিয়াহ আইনের প্রতি কটাক্ষ করে তার মস্তিষ্কপ্রসূত কিছু একটা আবিষ্কারের ইঙ্গিত দিয়েছেন। আমরা বলতে চাই, বাংলাদেশের জনগণ বা যেকোনো মানব সমাজের হাজারো সমস্যা সমাধানের কোনো নির্ভুল মহৌষধ আপনার কাছে নেই। আপনি বা আপনার সহকর্মীরা আপ্রাণ চেষ্টা করেও বাংলাদেশকে স্বর্গপুরী বানাতে পারবেন না বা মানুষকে পূর্ণ শান্তি দিতে পারবেন না। সে দাবি কোনো মানুষ করতেও পারে না। আজ পর্যন্ত কোনো নেতা বা দার্শনিক মানব সমাজের জন্য চির টেকসই উত্তম কোনো ব্যবস্খা দিতে পারেননি। মানুষের মতবাদগুলো একের পর এক ব্যর্থ বলে প্রমাণিত হচ্ছে। আমাদের বিশ্বাস প্রধানমন্ত্রী অবশ্যই সচেতন, তিনি এমন কিছু করবেন না যার ফলে লোকে এ কথা বলার সুযোগ পাবে যে, তিনি আল্লাহর দেয়া বিধান পরিবর্তনের দু:সাহস করছেন। তিনি নিশ্চয়ই জানেন, একমাত্র আল্লাহর আইনই নির্ভুল। এতে কেউ অদ্যাবধি কোনো ত্রুটি খুঁজে পায়নি। তিনিও পাবেন না। মানুষ তার মেধা দিয়ে সময়ের প্রয়োজনে অবশ্যই আইন প্রণয়ন করবে; কিন্তু তা হতে হবে আল্লাহর দেয়া মানদণ্ডের আওতায়। আল্লাহর দেয়া মানদণ্ডের বাইরে গিয়ে মানুষ যে আইনই রচনা করুক না কেন, আজ হোক কাল হোক তা ব্যর্থ হবেই। ব্যর্থতার ফল দেখার জন্য শুধু সময়ের অপেক্ষা করতে হয়। মোগল বাদশা আকবরের ‘দ্বীন-ই-এলাহি’ বা তুরস্কের কামাল আতাতুর্কের ‘লায়েকিজম’ টেকসই হয়নি। এমনকি পাকিস্তানের স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের মুসলিম পারিবারিক আইন সংশোধনের খায়েশও শেষ পর্যন্ত পূরণ হয়নি। এভাবে মানব সভ্যতার আরো উথান-পতনের ইতিহাসগুলো একবার দেখুন। মনে রাখবেন, মহাস্রষ্টার সীমা লঙ্ঘন করে কেউই টিকতে পারেনি। আর মহাপ্রলয়ের পরে আখিরাতে সবাইকেই জবাব দিতে হবে।
