Topic: ইসলামের আলোকে শিক্ষা ও জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব

জ্ঞান অর্জনের লক্ষ্যকে সামনে রেখে যে বিশেষ পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর ভেতরের ঘুমন্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে পারদর্শিতা লাভ করা হয় তাই শিক্ষা।শিক্ষার মাধ্যমেই মানুষের শারীরিক,মানসিক ও নৈতিক উন্নয়ন ও দক্ষতার্জনের পাশাপাশি সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে। ইসলামী পরিভাষায় শিক্ষার জন্য ৫টি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে-তারবিয়াহ,তালীম,তাদিব,তাদরীব ও তাদরীস।
সৃষ্টির শুরু থেকেই আল্লাহ প্রতিটি সৃষ্টির মাঝে কিছু না কিছু জ্ঞান দিয়ে দিয়েছেন।কিন্ত সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে মানুষকে কিছু জ্ঞানের পাশাপাশি বিবেক দিয়েছেন যাতে করে মানুষ ও পশুর মাঝে সহজেই পার্থক্য নিরুপণ করা যায়।সাধারণত জ্ঞানার্জনের জন্য আমরা ৪টি মাধ্যম ব্যবহার করে থাকি- ইন্দ্রিয়, বুদ্ধি,ইলহাম এবং ওহী।
মহান আল্লাহ মানুষের জীবন পথের পথনির্দেশক ও শিক্ষক হিসেবে যুগে যুগে বিভিন্ন জাতির জন্য অসংখ্য নবী ও রাসূল প্রেরণ করেছেন।যার সর্বশেষ সংযোজন হলেন আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা:)।তাঁর উপর নাযিলকৃত মহাগ্রন্হ আল কোরআনই কিয়ামত পর্যন্ত সমস্ত মানুষের হেদায়াত ও জ্ঞান অর্জনের একমাত্র উৎস। এ প্রসংগে আল কোরানে বলা হয়েছে-" আল্লাহর ইবাদত করার  ও তাগুতকে বর্জন করার নির্দেশ দেবার জন্য আমি তো প্রত্যেক জাতির মধ্যেই রাসূল পাঠিয়েছি, অত;পর তাদের কতককে আল্লাহ সৎ পথে পরিচালিত করেন এবং তাদের কতকের উপর পথভ্রান্তি সাব্যস্ত হয়েছিলো।সুতরাং পৃথিবীতে পরিভ্রমণ কর এবং দেখো,যারা সত্যকে মিথ্যা বলছে তাদের পরিণাম কি হয়েছে।"   (নাহল-৩৬)
শিক্ষা ও জ্ঞানার্জনের ব্যাপারে বিভিন্ন মনীষীগণ বিভিন্ন মতামত প্রদান করেছেন।
সিসেরোর মতে-'যতই উর্বরা হোক,একটা ক্ষেত যেমন কর্ষণ ছাড়া ফসল দিতে পারেনা, শিক্ষা ছাড়া মানুষের মনের অবস্হা ও তেমনি।'
আব্দুস সালাম খাঁ বলেছেন,' অজানা বিষয়কে জানার নাম শিক্ষা, আর জানা বিষয়কে কার্যে পরিণত করার নাম জ্ঞান।'
'চিকিৎসা দ্বারা মানুষের শরীর রোগমুক্ত হয় , কিন্ত শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের আত্মা ও বুদ্ধির বিকাশ ঘটে।' - আরবী সাহিত্য
টরেন্সের মতে জ্ঞান হল,'যা চোখের সামনে রয়েছে কেবল তাকেই দেখা নয়,বরং যা অনাগত তা দেখতে পাওয়ার মধ্যে রয়েছে প্রকৃত জ্ঞান।'
'জ্ঞানই একমাত্র উৎপন্ন সামগ্রী যা খরচ করলে কখনো কমতি পড়েনা।'  -লাও সি
শেখ সাদীর ভাষায় -'তুমি যা শিখলে তা যদি তোমার বাস্তব জীবনে রুপায়িত করতে না পারলে,তবে তুমি মহা অজ্ঞ।'
মুসলিম শরীফে বর্ণিত, রাসূল (সা:) বলেছেন,' সর্বোত্তম বাণী হচ্ছে আল্লাহর কিতাব এবং সর্বোত্তম পথ প্রদর্শন হচ্ছে মুহাম্মদের পথ প্রদর্শন।'তাই রাসূল (সা:) এর পথ অনুসরণ করতে হলে আমাদের ওহীভিত্তিক জ্ঞান অর্জন করতে হবে।
আরবী 'ইলম ' শব্দটি আলামত শব্দ হতে নির্গত হয়েছে,যা কোন বিষয় সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা লাভ করাকে বোঝায়,যার ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তী কার্যকলাপ পরিচালিত হয়। ইসলামে জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব যে কতটুকু তা আমরা পবিত্র কোরানে নাযিলকৃত সূরা আলাক থেকেই জানতে পারি।মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) এর প্রতি সবকিছুর আগে জ্ঞানার্জনের নির্দেশ দিয়েছিলেন এজন্য যে,আল্লাহর দাসত্ব ও রাসূলের আনুগত্য করতে হলে সর্বপ্রথম ইবাদাতের পন্হা না জানলে মানুষ বিভ্রান্তিতে নিমজ্জিত হতো।তাই রাসূল (সা:) ইরশাদ করেছেন,'প্রত্যেক মুসলিম নরনারীর ওপর ইলম তালাশ করা ফরয।'  ইবনে মাজাহ
সূরা যুমার ৯ নং আয়াতে বলা হয়েছে -'আপনি বলুন যারা জানে আর যারা জানেনা তারা কি কখনো সমান হতে পারে?কেবলমাত্র বুদ্ধিমান লোকেরাই তো নসীহত কবুল করে থাকে।'
আবু হুরায়রা (রা:) হতে বর্ণিত,রাসূল (সা:) বলেছেন,- মুনাফিক ব্যক্তির মধ্যে ২টি চরিত্রের সমাবেশ ঘটতে পারেনা। এর একটি হচ্ছে উত্তম চরিত্র বা নৈতিকতা এবং ২য়টি হচ্ছে দ্বীনের সুষ্ঠজ্ঞানোপলব্ধি। (তিরমিযী)
                              চলবে

Re: ইসলামের আলোকে শিক্ষা ও জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব

মূলত: ঈমান, ইলম ও আমল - এ ৩টি বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমেই মুসলমান ও কাফেরের মাঝে পার্থক্য নিরুপণ করা হয়।হাসান রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন,তিনি বলেছেন,জ্ঞান ২ প্রকার। এক প্রকার জ্ঞান মুখ ভেদ করে অন্তরে গিয়ে স্হান নেয়,এ জ্ঞানই কিয়ামতের দিন কাজে আসবে।আরেক প্রকার জ্ঞান হচ্ছে যা মুখ পর্যন্তই থাকে,কিন্ত অন্তরে পৌঁছেনা।আর এ জ্ঞানই কিয়ামতের দিন বনী আদমের বিরুদ্ধে স্বাক্ষ্য দিবে।সূরা আ'লার ৬-৮ নং আয়াতে শিক্ষা দান পদ্ধতি সর্ম্পকে বলা হয়েছে।শিক্ষা গ্রহণের জন্য উপদেশ দেয়া হয়েছে সূরা নাহলের ৯০-৯১ নং আয়াতে -'নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা,সদাচারণ ও আত্মীয়স্বজনকে দানের নির্দেশ দেন এবং তিনি নিষেধ করেন অশ্লীলতা,অসৎকার্য ও সীমালংঘন।তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ কর।'
শিক্ষার জন্য উপমা প্রদান করে বলা হয়েছে-'নিশ্চয়ই আল্লাহ মশক অথবা তদাপেক্ষা ক্ষুদ্রতর দৃষ্টান্ত বর্ণনা করতে লজ্জাবোধ করেননা।সুতরাং যারা ঈমান এনেছে তারা তা বিশ্বাস করবে যে,এ উপমা তাদের প্রভূর পক্ষ হতে খুবই স্হানোপযোগী হয়েছে।আর যারা কাফির হয়েছে,সর্বাবস্হায় তারা এটাই বলবে-এসব নগণ্য বস্তুর উপমা দ্বারা আল্লাহর উদ্দেশ্যই বা কি?তিনি এর দ্বারা অনেককে বিপথগামী করে থাকেন এবং এর দ্বারা অনেককে সঠিক পথ প্রদর্শন করে থাকেন।তিনি শুধুমাত্র ফাসিকদেরকেই বিপথগামী করে থাকেন।'   বাকারা -২৬
অন্যত্র সূরা ইব্রাহীমে ২৪-২৬ নং আয়াতে বলা হয়েছে-'তুমি কি লক্ষ্য করনা আল্লাহ কিভাবে উপমা দিয়ে থাকেম? সৎ বাক্যের তুলনা এক উৎকৃষ্ট বৃক্ষ যার মূল সুদঢ় ও যার শাখা প্রশাখা উর্ধে বিস্তৃত।যা প্রত্যেক মৌসুমে ফল দান করে তার প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে এবং আল্লাহ মানুষের জন্যে উপমা দিয়ে থাকেন যাতে তারা শিক্ষা গ্রহণ করে।কু বাক্যের তুলনা এক মন্দ বৃক্ষ যার মূল ভূ-পৃষ্ঠ হতে বিচ্ছিন্ন,যার কোন স্হায়িত্ব নেই।'
সবশেষে আমাদের জন্য সুশিক্ষার কত প্রয়োজন তা নিম্নোক্ত গল্পের মাধ্যমেই অনুধাবন করতে পারি,-
রাজার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধুটিই অশিক্ষত নিরক্ষর।প্রজারা এ নিয়ে মুখ টিপে হাসে আর রাজাকে নিয়ে ব্যঙগ-বিদ্রুপ,কানাঘুষা করে।রাজার ও এ নিয়ে পরিতাপের কোন অন্ত নেই।যে বন্ধু নিজের জীবন বিপন্ন করে সবার আগে রাজার বিপদে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়,তাকে শিক্ষাগ্রহণের কথা বলে না জানি সম্পর্কের ই না ইতি ঘটে!অনেক ভেবে চিন্তে উপায় বের করে রাজা একদিন তার বন্ধুটিকে কাছে ডেকে মনোপীড়ার কারণ খুলে বললেন এবং বন্ধুকে শিক্ষিত করে তোলার ব্যাপারে দৃঢ় আকাংখা ব্যক্ত করলেন।
যাচাই বাছাই করে রাজ্যের সবচেয়ে শিক্ষিত ও যোগ্য ব্যক্তিটিকেই রাজার বন্ধুর শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত করা হলো।যথানিয়মে শিক্ষা গ্রহণের পার্ট শেষ হলে রাজা প্রজাদের তাক লাগিয়ে নিন্দুকের মুখ বন্ধ করার জন্য ছাত্র ও শিক্ষকের মাঝে একটি পরীক্ষার আয়োজন করলেন।পিনপতন নিরবতার মাঝে শিক্ষক তার ছাত্রকে উদ্দেশ্য করে ১ আন্গুল ইশারা করলেন।ছাত্র তার প্রতিউত্তরে ২ আন্গুল ইশারা করলো। এরপর শিক্ষক দেখালেন ৫ আন্গুল আর ছাত্র তার উত্তরে মুষ্টিবদ্ধ হাত দেখালো।এবং সবশেষে শিক্ষক ছাত্রকে ১টি ডিম দেখালেন আর ছাত্র জবাবে ১টি পেঁয়াজ দেখালো।
    এবার ছাত্র ও শিক্ষক কে কি বুঝে কি বুঝাতে চেয়েছেন,তা আলাদাভাবে ডেকে বিশ্লেষন করতে বলা হল :-  শিক্ষক তার ছাত্রের প্রশংসায় পন্চমুখ হয়ে রাজাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,মহারাজ! এরকম ১জন মেধাবী ছাত্রের শিক্ষক হতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছি এবং সেজন্য আপনার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।আমি ১ আন্গুল দেখিয়ে বলতে চেয়েছি 'আল্লাহ এক'। আমার ছাত্র ঠিক উত্তরটি ই দিয়েছে ২ আংগুল দেখিয়ে যে, 'হযরত মুহাম্মদ (সা:) আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।'  এরপর আমি তাকে ৫ আন্গুল দেখিয়ে বলতে চেয়েছি 'আল্লাহর রাসূলের সাথে আরো ৪জন সাহাবী ছিলেন।' এবং সে মুষ্টিবদ্ধ হাত দেখিয়ে বলেছে 'তাঁরা প্রত্যেকে ঐক্যবদ্ধভাবে দ্বীনের কাজ আন্জাম দিয়েছেন।' সবশেষে ১টি ডিম দেখিয়ে বলেছি'পৃথিবীটা ডিম্বাকৃতির।' জবাবে সে ১ টি পেয়াঁজ দেখিয়ে বলেছে'পৃথিবীতে হাসি আনন্দের পাশাপাশি কান্না এবং দু:খ রয়েছে।'
এবার ছাত্রকে ডাকা হলো।কাঁদো কাঁদো মুখে রাজাকে সে অভিযোগ করলো,মহারাজ! আপনি আমার জন্য কি ধরণের লোককে বাছাই করেছেন?ঐ ব্যাটা মিথ্যুক, সে আমার ১টা চোখ উপড়ে ফেলবে বলাতে আমি তার ২টা চোখই উপরে ফেলবো বলেছি।এরপর সে আমাকে থাপ্পড় দিয়ে দাঁত ফেলে দিবে বলছে।আমিও বলছি ঘুষি মেরে তার নাকটাই আমি ফাটিয়ে দেবো। কত্ত বড় সাহস! এরপর সে আমাকে বলে কিনা ডিম মেরে আমার মাথা ফাটাবে! আমি বলছি, আমি ঐ ডিমটাকে পেঁয়াজ দিয়ে ভেঁজে খাবো। আর এখন সে কিরকম ভালো সাজলো আপনার কাছে?এর একটা বিহিত আপনাকে করতেই হবে।
শিক্ষার মধ্যে যদি নৈতিকতাবোধ জাগ্রত করার পদক্ষেপ না থাকে,তাহলে ঐ ছাত্রের মত আমাদের অবস্হাও সেরকম হবে।ভালো কিছু আত্মস্হ করতে পারবোনা।বরং সুন্দর শিক্ষা ও অসুন্দর হতে বাধ্য।

Re: ইসলামের আলোকে শিক্ষা ও জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব

ধন্যবাদ সুন্দর গল্পের জন্য ।

এ দুনিয়ার রঙ্গমঞ্চে কেউ হাসে আর কেউবা গায়
কেউবা কাঁদে চ্ছিন্নবস্ত্রে কেউবা স্বর্নের বিছানায়
কেউবা হাসে ফাঁসির মঞ্চে কেউবা বসে গাছতলায়
জানো সবে নিজ পরিচয়, করছ সবাই অভিনয় ।।

Re: ইসলামের আলোকে শিক্ষা ও জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব

ধন্যবাদ আপা ! কুরআন , হাদিস আর বাস্তব জীবনের উপমা সমন্বিত সুন্দর ও শিক্ষামুলক লেখাটি পড়ে খুব ভালো লাগলো। আল্লাহ আমাদের সবাইকে যথার্থ শিক্ষা গ্রহণের ও প্রচারের তওফিক দান করুন। আমীন!